অনুসন্ধান

    পৃথিবীর সব দেশে কি একটি সার্বজনীন মূদ্রার প্রচলন সম্ভব?

    কেমন হতো, যদি আপনি একটি সার্বজনীন মুদ্রা দিয়ে বিশ্বের যে কোন দেশে ভ্রমণ ও কেনাকাটা করতে পারতেন?


    বিভিন্ন দেশের মুদ্রার নোটের কোলাজ – কি সম্ভব একক সার্বজনীন মুদ্রা?

    বিশ্বের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে বিভিন্ন দেশের মুদ্রার দাম ব্যাপকভাবে ওঠানামা করছে। ইউএস ডলারের বিপরীতে বাংলাদেশি টাকার দাম এবছরের ৬ জুন ৯০ টাকার মাইলফলক পার করে এবং আজ ১৭ নভেম্বর, ২০২২ তারিখে প্রতি ডলার ১০৩ টাকার ওপরে লেনদেন হচ্ছে।

    এ থেকেই আমার মনে একটা প্রশ্নের উদয় হয়ঃ

    সারা বিশ্বে কি একটি সার্বজনীন মূদ্রার প্রচলন সম্ভব?

    যদি প্রশ্নটি আপনার কাছে ইন্টারেস্টিং মনে হয় তাহলে চলুন, একসাথে উত্তর খুঁজি।

    কেউ কি নিকট অতীতে একটি সার্বজনীন মূদ্রার প্রস্তাব তুলেছিলেন?

    হ্যাঁ। বর্তমানে বিশ্বের ১৯৭ টি দেশে ১৮০ টি মুদ্রা প্রচলিত আছে। ইউরোপের ১৯ টি দেশে ইউরোপীয় ইউনিয়ন প্রবর্তিত মুদ্রা “ইউরো” প্রচলিত।

    এই আইডিয়ার ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, নোবেল লরিয়েট রবার্ট মান্ডাল ১৯৬১ সালে A Theory of Optimum Currency Areas শিরোনামে একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন। তিনি ইউরোপের উদাহরণ দিয়ে যেসব রিজিওনে জাতীয় মুদ্রাগুলি একটি আরেকটির খুব কাছাকাছি, সেখানে একটি “অপটিমাম কারেন্সি”এর কথা বলেন।

    তিনি প্রতিটি দেশের আলাদা আলাদা মুদ্রা থাকার ফলে যেসব অসুবিধা হয় সেসব তুলে ধরেন এবং এটাও স্বীকার করেন যে ভূরাজনৈতিক বিষয়গুলো আমলে নিলে আসলে সকল দেশে একটি মুদ্রার প্রচলন করা সহজ কিছু না। তবে যদি করা যায় সেটা সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর জন্য অনেক সম্ভাবনা নিয়ে আসবে।

    এর অনেক পরে, ১৯৯৯ সালের ১লা জানুয়ারি প্রায় ১০ বছরের প্রস্তুতির পর ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইউরোর প্রবর্তন করে। প্রথম ৩ বছর এটি একটি অদৃশ্য মুদ্রা ছিলো। অর্থাৎ, শুধু হিসাব-নিকাশের খাতায় এবং ইলেকট্রনিক লেনদেনের ক্ষেত্রে ইউরো ব্যবহৃত হয়েছে। তারপর ২০০২ সালের ১লা জানুয়ারি তারা প্রথম ১২ টি দেশে ইউরো ব্যাঙ্ক নোট প্রচলন করে।

    তবে ১৯৮৪ সালে হার্ভার্ড প্রফেসর রিচার্ড কুপার একটি “কমন কারেন্সি” এর প্রচলনের প্রস্তাব করেন। তার প্রস্তাবনার মধ্যে সকল গণতান্ত্রিক দেশের একটি সার্বজনীন মুদ্রা, একটি সম্মিলিত কেন্দ্রীয় ব্যাংক, এবং একটি কমন আর্থিক নীতিমালা বা পলিসির কথাও উল্লেখ করেন। তিনি এক ধাপ এগিয়ে একটা ভবিষ্যৎ বাণীও দিয়ে ফেলেন যে ২০১০ সালের মধ্যে সারা বিশ্বে একটি সার্বজনীন মুদ্রা চালু হয়ে যাবে!

    একটি সার্বজনীন মুদ্রার প্রচলন হলে লাভ কার?

    কমবেশি সব দেশই একটি সার্বজনীন মুদ্রা থেকে উপকৃত হতে পারে।

    একটি সার্বজনীন মুদ্রার প্রচলন হলে কি ধরণের সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে?

    একটি সার্বজনীন মুদ্রার জন্য দরকার একটি সম্মিলিত কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক যা বিশ্বব্যাপী ব্যাঙ্ক নোটের প্রবর্তন, বিতরণ, এবং নিয়ন্ত্রণের জন্য নীতিমালা তৈরি করবে। আর্থিক নীতিমালা যে কোন দেশের অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ এবং উন্নয়নের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ন হাতিয়ার। ২০০৮ সালের অর্থনৈতিক মন্দার সময় আমেরিকা সুদের হার ব্যাপক হারে কমিয়ে ফেলে এবং টাকার যোগান বৃদ্ধি করে মন্দা থেকে উত্তরণের চেষ্টা করে।

    সার্বজনীন মুদ্রার প্রচলনের ক্ষেত্রে আরেকজন হার্ভার্ড প্রফেসর কেনেথ রোগফ কিছু সমস্যা চিহ্নিত করেন -

    শেষকথা

    বিশ্বের বর্তমান পরিস্থিতিতে একটি সার্বজনীন মুদ্রার আইডিয়া আসলে বাস্তবসম্মত নয়। তবে রবার্ট মান্ডাল এর প্রস্তাবনা বিবেচনা করলে ভবিষ্যতে হয়তো ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো রিজিওন ভিত্তিক মুদ্রার প্রচলন হতেও পারে! যেমন, সার্কভুক্ত দেশগুলোর জন্য একটি কমন মুদ্রা, আফ্রিকার কাছাকাছি অর্থনৈতিক সামর্থ্যের দেশগুলোর মধ্যে একটি কমন মুদ্রা, দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলোর সমন্বিত একটি মুদ্রা, ইত্যাদি।

    ডিজিটাল কারেন্সি যদি ভবিষ্যতে বিশ্বব্যাপী প্রচলিত হয়ে যায়, তখন কোন একটা সময়ে গিয়ে এই সার্বজনীন মুদ্রার আইডিয়াটি বাস্তবসম্মতও মনে হতে পারে যেহেতু প্রিন্ট এবং বিতরণজনিত ঝামেলা তখন আর থাকবে না।

    তারপরেও বিশ্বব্যাপী রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব আদৌ কখনো নিরসন করা সম্ভব হবে এই আশা খুব একটা করা যায় না। সুতরাং নিকট ভবিষ্যতে এমন একটি স্বার্বজনীন মুদ্রার প্রচলন হবে না বলেই মনে হয়।

    লেখাটি কেমন লাগলো?